Five Poems

Hindol Bhattacharjee

যেন অভিশাপ সহ্য করতে পারবে না বলে, নেমে পড়েছ মাঠে। এভাবে ধান চাষ হয় না। কৃষক প্রতিটি গাছের
গোড়ায় তাঁর রক্তদান করেন। ফোঁটা ফোঁটা রক্তের সার ছড়িয়ে পড়ে ধানগাছের ভিতর। আমরা রক্তপান করি।
শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে যায় তার ঘুম, স্বপ্ন, আনন্দ, ঘাম, শ্বাসকষ্টগুলো। আকাশে বিষাক্ত ধোঁয়া,
থমথম করছে কুয়াশার অন্ধকার। তার মধ্যে দিয়েই আমি তোমার কাছে আসছি। আর কেউ অভিশাপ দিচ্ছে
আমাদের। সমস্ত শহর জুড়ে ছিটিয়ে দিচ্ছে রক্ত। এই রক্ত আচমন করতে পারব না আমরা কেউ। কারা যেন
সারিবদ্ধ ভাবে শুয়ে পড়ছে হাইওয়ের উপর। ওই যেখানে গম্বুজ, তার নীচের রহস্যে ঘেরা জানলার ফাঁক দিয়ে
উঁকি দিয়ে বিশ্বাসবাড়ির পাগল ছেলেটা সাবধান করছে কলকাতা শহরকে। আমাদের শরীরে তার রক্ত বইছে,
ধানের রক্ত, কৃষকের রক্ত, আলপথে পড়ে থাকা কৃষকজননীর রক্ত। এত পাপ নিয়ে ধানচাষ হয় না। গরম
গরম ভাত খাও বরং। মানুষের মুখের থেকে কেড়ে নিয়ে শুরু হোক নবান্ন। হেমন্তে সাইরেন বাজে কোথাও না

কোথাও। যুদ্ধ শুরু হয়। এই কলকাতা শহর শুনতে পায় না। তুমি তর্ক শুরু করো। কেউ কেউ শুরু করে উপন্যাস।
ধারাবাহিক। ক্রমশ প্রকাশ্য।

দৃষ্টি
চশমাবিক্রেতার মতো, মানুষের চোখের দিকে তাকিয়ে রয়েছি। কত মাটি পেরোতে পেরোতে নদী আসে,
সব ধরা পড়ে চোখের ভিতর। কেউ কম দেখে, কারো দৃষ্টি চলে যায়। কেউ বা আলোর দিকে তাকাতে
পারে না। দৃষ্টি, কেউ কেউ পায়, কেউ পায় না। সব অশ্রু কান্না নয়, এতদিনে বুঝি। জানি
অক্ষরগুলি ছোট হয়, ঝাপসা হয়। মানুষ তাকিয়ে থাকে এই পৃথিবীর দিকে। যন্ত্রণা নিয়ে, ভালোবাসা
নিয়ে, আদর নিয়ে, বিচ্ছেদ নিয়ে, মনখারাপ নিয়ে, মানুষ জীবনের দিকে তাকিয়ে থাকে মা পাখির
মতো।
যেন চোখ ফুটবে একদিন।

সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ
গোঙানির শব্দ, যত দূরেরই হোক, খুব কাছের মনে হয়। যে কষ্ট পায়, তার কোনও দেশ নেই, ভোট নিয়ে তার
মাথাব্যথা নেই। সে জানে ঈশ্বর মানেই পেনকিলার, ধর্ম মানেই একফোঁটা জল, যার জন্য তার জিভ শুকিয়ে
কাঠ হয়ে আছে। নিজের মায়ের মুখ সে দেখতে পায় প্রতিটি নার্সের মুখে। নিজেরই প্রেমিকা এসে তার জ্বর
মাপে। ঘরের জানলা খুলে দিয়ে বলে, আলো আসুক একটু।
গোঙানির শব্দ, যে যন্ত্রণারই হোক, তার কোনও অনুবাদ হয় না। একটা ফাঁকা ঘরে সে শুধুই পেতে চায় তার
মাকে। অভিযোগ জানায় এ জীবনের জন্য। মায়ের চোখের জল দেখলে সে দাঁতে দাঁত চেপে বলে, ভালো হয়ে যাব।
এবার সূর্য উঠলে, আর রাত হবে না কোনোদিন।
খুব ভোরে, যখন গোঙানির শব্দ ঘুমিয়ে পড়ে, শুকনো পাতার উপর দিয়ে কারা কারা হেঁটে যায়! বুঝি, তারা ঘরে
ফিরছে। মাথায় সংসার। খিদের ওজন কত বেশি হলে আর রাস্তা পেরোনো যায় না, এ কথা কেউ কেউ জানে।
এটুকুই মানুষের যুদ্ধসংবাদ। এটুকুই, যুদ্ধবিরতি।

গ্রন্থ
একটি বিন্দুও অনন্ত, তাই মহাসাগর না লিখলে শিল্প বৃদ্ধ হয়ে যায় না। মহাসাগরও বিন্দুবৎ। তা দেখার
চোখ তোমার নেই। যে বাঁশি হাওয়ায় বাজছে, স্রোতে ভেসে যাচ্ছে যার মৃত্যু, তুমি তার কাছে নতজানু থেকো।
একটি কবিতা, শুধু, একটি কবিতাই, লেখা হয় একটি জীবনে।
মুখ দিয়ে গলগল করে বেরিয়ে যেতে পারে গত শতাব্দীর ধোঁয়া।একঘটি জল আলগোছে খেতে খেতে বলে উঠতে
পারো, এই ছোট্টো মুহূর্তের জন্যই বেঁচে আছ তুমি। ঘরভর্তি ক্ষেত, জানলা ভর্তি আকাশ, মাথা ভর্তি
রোদ্দুর আর পায়ে পায়ে উঠে আসা নদীর সঙ্গে ঘর করবে তখন। এমন এক বাড়ি লিখবে, যার কোনও দেওয়াল

নেই, ছাদ নেই, জানলা রয়েছে। শূন্যে ভাসছে ঘড়ি। হাজার-লক্ষ বছরের পুরোনো বাগান কড়া নেড়ে বলছে, আমি
তৈরি। আমাকে লাঙল দাও, সার দাও, বীজ দাও।
একটি বিন্দুও অনন্ত, একটি কবিতাও তোমায় ঈশ্বর করে তুলতে পারে। একটি রেখার দিকে তাকিয়ে থাকে
পৃথিবীর সব আদি মন্ত্র, কাব্য, সঙ্গীত। সংসার লেখার প্রয়োজন নেই, মহাসাগর লেখার প্রয়োজন নেই।
ঘন ঘন জন্ম নাও। ঘন ঘন ঘুম থেকে ওঠো। সূর্যের দিকে তাকাও। আলোর ভিতর গিয়ে নগ্ন হও। স্নান কর।
একটি বিন্দুই লেখো শুধু, যা তোমার আগে, লেখা হয়নি কখনও। পরে, যা লেখা হবে না আর।

রেড বুক

একটি পংক্তির মধ্যে, গাড়িবারান্দার মতো, কিছু থাকে। আলো-হাওয়া খেলে, ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠেন ন-পিসিমা,
ওপাশের রহস্যময়ী জানলা দিয়ে সহজবৌদির থমথমে মুখ, আর ছানি পড়া চোখে বড়দাদুর বারান্দার চেয়ার
থাকে। কোন অসীমের দিকে এই সব তাকিয়ে থাকা রয়ে যায়, বুঝি না। বুঝি না, কেন তোমার নাম আমি মনে
করতে পারি না এখন আর। গতজন্মে দেখা হয়েছিল কি? ঘুমের ভিতর কোনও ট্রামলাইন পেরোতে পেরোতে
আচমকা আমার চোখের দিকে তাকিয়েছিল তোমার দু চোখ? শুনি, এসব প্রাচীন কথা লেখা হয়ে গেছে। দুহাজার
বাইশ সালে কোনও জাতিস্মর নেই। কলকাতার বারান্দা থেকে উত্তরবঙ্গের রেলস্টেশন দেখার মতো
বাইরের দিকে যে চোখ তাকিয়ে থাকে, তার শীত করে একটু একটু। শুকনো কাঠ পাতা জড়ো করে আগুন
জ্বালানোর মতো দু একটি ভুটিয়ার দোকান আজও রাত-পাহারা দেয়।
যে সোয়েটার বুনে চলে, তার কাছে শীত আসে না। রোদ্দুর পড়ে জানলা দিয়ে, যেন বুড়ি দিদিমার বেড়ে দেওয়া
ভাত। ধোঁয়া উঠছে। পাতে একটা লেবু এবং আলুভাতে। এই শীতকালেও একটা হাত পাখা নিয়েই উবু হয়ে বসে
পড়েছেন তিনি। মাটিতে শতচ্ছিন্ন একটা আসন। এই আসনের নাম আদর। আমি তোমাকে ভুলিনি ব্রজরানি,
যে বাঁশি হয়ে বেজেছিলাম রাত্রিবেলায়, তুমি তার কাছে এডওয়ার্ড সঈদের পাণ্ডুলিপি বাড়িয়ে দিয়েছ। আমি
শুনি আদিম এক মাদল। রাতের ভেতর দিয়ে বেজে ওঠে মহাবিদ্রোহের মাস। এই পুকুরের ধারে কে বসেছিল
তখন শ্রীমতী? এই অন্ধকার কারা পেরোতে পেরোতে জানিয়ে দিয়েছিল, তিনি আসছেন, ভয় পেও না। জানলা
দরজা খুলে রাখো। সন্ধ্যাবেলা ঘরে বসে থেকো না আর। তিনি আসছেন।
আমরা একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে রয়েছি বহুদিন। আমরা একে অপরের হাত ছেড়ে দিয়েছি বহুদিন। কত
বাজার তার পর মাটির নীচে ডুবে গেল। কত ঘর শহর আর কত গ্রাম হয়ে গেল বালি। আমরা তাকিয়ে রইলাম।
সত্তর দশক থেকে বারান্দায় অপেক্ষা করা পিসিমার মতো, আমরা জানি, ভগবান আছেন। বিপ্লবও হবে
একদিন।
তিনি আসবেন। তিনি আসছেন। তিনি এসে পড়েছেন প্রায়।